# **১. যাকাতের বিধান কখন এবং কার উপর প্রথম ফরজ করা হয়েছিলো?**
কুরান অনুযায়ী নবী ইব্রাহিমের সময়কাল থেকে মানবজাতির উপর যাকাত ফরজ করা হয়।
**[২১:৭৩] “আর তাদেরকে আমি নেতা বানিয়েছিলাম, তারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে সঠিক পথ দেখাত। আমি তাদের প্রতি সৎকাজ করার, সালাত কায়েম করার এবং যাকাত প্রদান করার জন্য ওহী প্রেরণ করেছিলাম। আর তারা আমারই ইবাদাত করত।“**
# **২. কুরান অনুযায়ী যাকাতের সংজ্ঞা কী?**
**[১৪:৩১] “আমার বান্দাদের বল, ‘যারা ঈমান এনেছে, তারা যেন সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, ঐ দিন আসার পূর্বে যে দিন কোন বেচা-কেনা থাকবে না এবং থাকবে না বন্ধুত্বও।“**
অনুরূপভাবে, [০২:০৩] আয়াতেও সালাতের পাশাপাশি আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক থেকে ব্যয় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কুরানের অনেকগুলো আয়াতে আমরা দেখতে পাই সালাতের পাশাপাশি যাকাত প্রদানের কথা বলা হয়েছে। যেমন:
**[২:১১০] “আর তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত দাও এবং যে নেক আমল তোমরা নিজদের জন্য আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর নিকট পাবে। তোমরা যা করছ নিশ্চয় আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।“**
সালাত এবং যাকাতের আয়াতগুলো সব পাশাপাশি রাখলে আমরা বুঝতে পারি যাকাত হলো একপ্রকার ব্যয়, যা উপার্জনক্ষম সকল ঈমানদারের উপর ফরজ।
# **৩. কখন যাকাত দিতে হবে?**
**[৬:১৪১] “তোমরা তার ফল থেকে আহার কর, যখন তা ফলদান করে এবং ফল কাটার দিনেই তার হক দিয়ে দাও।“**
উক্ত আয়াতে প্রদেয় হক এর ক্ষেত্রে 'ওয়া-আতু' কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে, ঠিক যেমনটি যাকাতের আগে প্রতিবার 'ওয়া-আতু' কথাটির উল্লেখ আছে, যার বাংলা অর্থ হলো 'দিয়ে দাও' বা 'প্রদান করো'। সুতরাং, এই প্রদেয় হকই হলো যাকাত। এই আয়াত অনুযায়ী যাকাত প্রদানের সময় হলো ফল/ফসল কাটার দিন (the day of harvest). কিন্তু বর্তমানে যেহেতু কৃষিব্যবস্থা সেরকমভাবে চালু নেই এবং অধিকাংশ লোক চাকরিজীবী, সেহেতু তাদের যাকাত প্রদান করতে হবে যেদিন তারা বেতন হাতে পায় সেদিন।
প্রচলিত ব্যবস্থায় যাকাত প্রদান করা হয় ১ বছর পরপর, এই কারণে দেখা যায়া যাকাতের জন্য দরিদ্র লোকদের দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়। কুরানে এর কোনো ভিত্তি নেই। উপার্জনের অর্থ হাতে এলেই তার থেকে যাকাত প্রদান করতে হবে।
# **৪. কাদের উপর যাকাত ফরজ?**
[৬:১৪১] আয়াত অনুযায়ী যাকাত শুধুমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের উপর ফরজ। তাই যারা উপার্জন করে না তাদের কোনো যাকাত দিতে হবে না।
জীবনের সকল মৌলিক চাহিদা (যেমন: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা) পূরণের পর যদি কিছু উদ্বৃত্ত থাকে তার থেকেই কেবল যাকাত দিতে হবে।
**[২:২১৯] “তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে। বল, ‘যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত’।“**
সুতরাং, কারো উপার্জন যদি এতটাই কম হয় যে তার পুরোটাই নিজের এবং পরিবারের পিছনে ব্যয় হয়ে যায় তাহলে তার আর যাকাত দিতে হবে না।
**[২২:৭৮] “তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। দীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি।”**
# **৫. কাদেরকে যাকাত দিতে হবে?**
**[১৭:২৬] “আর আত্মীয়কে তার হক দিয়ে দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরকেও। আর কোনভাবেই অপব্যয় করো না।“ (আরও দেখুন ৩০:৩৮)**
উক্ত আয়াতে ব্যবহৃত ‘হক’ শব্দটি ‘প্রাপ্য অধিকার’ নির্দেশ করে। আর তাদের এই প্রাপ্য আদায় করতে হবে আল্লাহ প্রদত্ত ফরজ বিধান যাকাতের মাধ্যমে।
**[২:২১৫] “তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? বল,‘তোমরা যে সম্পদ ব্যয় করবে, তা পিতা-মাতা, আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য। আর যে কোন ভাল কাজ তোমরা কর, নিশ্চয় সে ব্যাপারে আল্লাহ সুপরিজ্ঞাত।“**
এই আয়াতের তালিকা অনুযায়ী দেখা যায়, যাকাতের সর্বপ্রথম হকদার হলো পিতা-মাতা (যদি তারা দরিদ্র হয়)। কেননা আত্মীয়দের মধ্যে নিকটতম আত্মীয় হলো পিতা-মাতা। এরপর যথাক্রমে অন্যান্য আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য ব্যয় করতে হবে।
প্রচলিত ধারার অনেক স্কলার বলে থাকেন শুধুমাত্র মুসলিমদেরকেই যাকাত দেওয়া যাবে, এর কোনো কুরানিক ভিত্তি নেই। [১৭:২৬] আয়াত থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়যে যেকোনো ধর্মের লোকই যাকাতের হকদার হতে পারে।
# **৬. কতটুকু যাকাত দিতে হবে?**
এর উত্তর হলো কুরানে যাকাতের কোনো নির্ধারিত পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। প্রচলিত ধারায় ২.৫% হারে যাকাত দেওয়ার যে নিয়ম আছে, কুরানে এর কোনো ভিত্তি নেই।
আল্লাহর বিধান হলো যার যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী যাকাত দিতে হবে।
**[১৭:২৬-২৯]**
**“আর আত্মীয়কে তার হক দিয়ে দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরকেও। আর কোনভাবেই অপব্যয় করো না।“**
**“নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।“**
**“আর যদি তুমি তাদের থেকে বিমুখ থাকতেই চাও তোমার রবের পক্ষ থেকে রহমতের প্রত্যাশায় যা তুমি চাচ্ছ, তাহলে তাদের সাথে নম্র কথা বলবে।“**
**“আর তুমি তোমার হাত তোমার ঘাড়ে আবদ্ধ রেখো না এবং তা পুরোপুরি প্রসারিত করো না তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।“**
[১৭:২৯] আয়াতে “তুমি তোমার হাত তোমার ঘাড়ে আবদ্ধ রেখো না এবং তা পুরোপুরি প্রসারিত করো না” – এই কথার অর্থ হলো অতিরিক্ত কার্পণ্যও করা যাবে না আবার দান করতে গিয়ে সবকিছু উজাড়ও করে দেয়া যাবে না। মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।
# **৭. যাকাতের গুরুত্ব**
যারা যাকাত প্রদান করে তাদের জন্য আল্লাহ কুরানে রহমতের ঘোষণা দিয়েছেন।
**[৭:১৫৬] “আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে। সুতরাং আমি তা লিখে দেব তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যাকাত প্রদান করে। আর যারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান আনে।“**
# **৮. যাকাত এবং সাদাকার মধ্যে পার্থক্য কী?**
[৬:১৪১] এবং [১৭:২৬] আয়াতে ব্যবহৃত ‘হক’ শব্দটি প্রমাণ করে যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক ইবাদত। অন্যদিকে সাদাকার আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এটি কোনো ফরজ ইবাদত নয়।
যাকাত দিতে হয় বেতন হাতে পাওয়ার পর, অন্যদিকে সাদাকা দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই।
আমাদের সমাজে ‘যাকাতের মাসারিফ’ নামে যে ৮টি খাত প্রচলিত আছে, কুরান অনুযায়ী সেগুলো মূলত সাদাকার খাত।
**[৯:৬০] “নিশ্চয় সদাকা হচ্ছে ফকীর ও মিসকীনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য; (তা বণ্টন করা যায়) দাস আযাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।“**
এই আয়াত থেকে দেখা যায়, যারা সাদাকা বণ্টনের কাজে নিয়োজিত তাদেরও সাদাকা প্রদান করা যেতে পারে।
শুধু যে অর্থ, পোশাক বা খাদ্য দিয়েই সাদাকা আদায় করা যায় ব্যাপারটা এমন নয়, যেকোনো ভালো কাজই সাদাকা হতে পারে।
**[৯:১০৪-১০৫] “তারা কি জানে না যে, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবূল করেন এবং সাদাকা গ্রহণ করেন। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবূলকারী, পরম দয়ালু।“ “আর বল, ‘তোমরা আমল কর। অতএব, অচিরেই আল্লাহ তোমাদের আমল দেখবেন, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণও। আর অচিরেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে গায়েব ও প্রকাশ্যের জ্ঞানীর নিকট। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে জানাবেন যা তোমরা আমল করতে সে সম্পর্কে’।“**
# **সারসংক্ষেপ:**
যাকাত প্রদান করা উপার্জনক্ষম সকল ঈমানদার ব্যক্তির উপর ফরজ। পারিশ্রমিক বা বেতন হাতে পাওয়ার পর একজন ব্যক্তি:
১. সর্বপ্রথম তার স্ত্রী, পরিবার-পরিজনের সকল মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য খরচ করবে।
২. এরপর যদি কিছু বাকি থাকে তা থেকে নির্ধারিত খাতে যাকাত দিবে।
৩. যাকাত আদায়ের পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে সেগুলো নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী ব্যয় করা যাবে, তা হতে পারে নিজের বা পরিবারের শখ পূরণে, সঞ্চয় বা বিনিয়োগে ইত্যাদি।
No comments:
Post a Comment